Viral Ghibli Trend: সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই এখন ফিড জুড়ে শুধু ‘জিবলি’ ট্রেন্ড। শুধু ভারত নয়, এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ। বাদ যাননি তাবড় তাবড় রাজনীতিকরাও। বিশ্ববিখ্যাত জাপানি শিল্পী হায়াও মিয়াজাকির কালজয়ী সৃষ্টি স্টুডিয়ো জিবলি আর্ট। বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবাদে তা এখন সকলের মুঠোফোন। যে কেউ চাইলেই কয়েক সেকেন্🐟ডের মধ্যে নিজেকে মিয়াজাকꩵি-সৃষ্ট চরিত্রের আদলে গড়ে নিচ্ছেন।
শিল্পীদের বিপদ ডেকে আনছে এআই?
তবে সোশাল মিডিয়ার এই ট্রেন্ডের প্রতিবাদও করছেন অনেকে। শিল্পীর দীর্ঘ শ্রম ও অধ্যাবসায়ের ফসল অনুমতি ছাড়াই যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। একে শিল্পীর প্রতি একরকম অসম্মান প্রদর্শন বলেই মনে করছেন অনেকে। স্রষ্টা মিয়াজাকিও বিষয়টির বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যেই এআই সংস্থাগুলিকে লিগাল নোটিস দিয়েছে জিবলি স্টুডিয়ো। বর্ষীয়ান শিল্পীর কথায়, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের এই সৃষ্টিকর্ম নকল করা আদতে ‘An insult to life itself’। কিন্তু সত্যিই কি প্রাণের প্রতি অপমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? মিয়াজাকির বিশ্বাস ও শিল্পরীতি মেনে কি এআই-কে দূরে সরিয়ে রাখা উচিত শিল্পীদের? জিবলির ভাইরাল আবহে ফের একবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন অনেকে। বাঙালি আঁকিয়েদের কী উত্তর এই প্রসঙ্গে? শুনল হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা।

‘ফটোশপ নিয়েও এমন প্রশ্ন উঠেছিল’
বইপাড়ার বিখ্যাাত শিল্পী ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের মতে, প্রযুক্তির উন্নতি অপ্রতিরোধ্য। ব্যোমকেশ কমিকসসহ একাধিক জনপ্রিয় কমিকসেဣর স্রষ্টা জানাচ্ছেন, ‘আমার এখনই আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স নিয়ে কোনও আপত্তি বা অসুবিধা নেই। বেশ কিছু বছর আগে বাজারে যখন ফটোশপ বা ছবি আঁকার সফটওয়ার এসেছিল, তখনও অনেকেই নানা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমরা এত পরিশ্রম করে একটা ছবি আঁকি। ভুল হলে বারবার মুছতে হয়। একটা ছবি আঁকতে যেখানে তিনদিনে লেগে যায়, সেখানে এক ঘণ্টায় হয়ে যাচ্ছে সবটা! তাহলে পরিশ্রমের মূল্য কী রইল?’
‘প্রযুক্তি যদি সহায়তা করে’
ওঙ্কারনাথের কথায়, ‘আমি এই প্রতিক্রিয়ার বিপক্ষেই ছিলাম। তখন থেকেই নিজের শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি বারবার। তাতে লাভ বৈ ক্ষতি হয়নি। আমার একটা কথাই মনে হয়, প্রযুক্তির উন্নতি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তুমি শিল্পীই হও আর যে-ই হও, দিনের শেষে একজন মজুর। আমরা কাজ করি, তার বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করি। সেই কাজে কোনও প্রযুক্তি যদি সহায়তা করে, তাহলে কতদিনই বা তাকে দূরে সরিয়ে রাখব? বরং কেউ যদি মনে করেন, একজন প্রযুক্তিকে দূরে সಌরিয়ে রেখে প্রাচীন পদ্ধতিতেই কাজ করবেন, তবে এক সময় তিনি বাতিল হয়ে যেতেও পারেন।’
‘আসল প্রশ্ন, এআই ব্যবহার কীভাবে করছেন?’
শুকতারা, কিশোরভারতীসহ নানা পত্রপত্রিকা দীর্ঘদিন যাদের কমিকসে সমৃদ্ধ হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শিল্পী অর্ক পৈতণ্ডী। বর্তমানে মায়াকানন পত্রিকার কর্ণধার অর্ক শিল্পে এআইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য মনে করেন। তাঁর ܫকথায়, ‘প্রযুক্তির আগ্রাসন নিয়ে বিতর্ক আগেও হয়েছে। একটা সময় শিল্পীরা পেন-পেপারে ছবি আঁকতেন। তারপর যখন কম্পিউটার এল, সাবেকি শিল্পীরা অনেকেই খুশি হননি। তাঁরা বিষয়টিকে শিল্প পদবাচ্য বলে মনে করতেন না। একটা সময় আমরাও খাতায় ছবি আঁকতাম। কিন্তু একদিনে যখন অনেক ছবি আঁকতে হবে, তখন প্রযুক্তির ব্যবহার করা ছাড়া উপায় নেই। এবার আসল প্রশ্ন, এআই ব্যবহার কীভাবে করছেন? প্যানেলের পর প্যানেল ছবি বা কমিক স্ট্রিপ আঁকার সময় এআই খুব উপযোগী। একটা ছবি একজন আর্টিস্টের আঁকতে যতটা সময় লাগে, তার থেকে বহু কম সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স এক-একটা ছবি বানিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং, এআই-কে ভবিষ্যতে অস্বীকার করা 🐬কিন্তু যাবে না। সাধারণ মানুষের কাছে এটা একটা খেলার মতো। ফেসবুক যেমন নিজের অবতার বানানোর অপশন আছে, এও অনেকটা তেমন।’

‘সাহিত্য বা শিল্পের কি ক্ষতি করছে এআই?’
আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের ব্যবহারকে প্রাণের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন বলেও মানতে ন🎃ারাজ অর্ক। তাঁর কথায়, ‘তাহলে কি গাড়ি চড়া আমার পায়ের প্রতি অসম্মান? কম্পিউটারে টাইপিং বা ভয়েস টাইপিং করে লেখা কলমের প্রতি অসম্মান না পেন দিয়ে লেখা কি পাখির পালকের প্রতি অসম্মান? লক্ষ করুন, এগুলো ব্যবহার করে সাহিত্য বা শিল্পের কিন্তু ক্ষতি হয়নি, বরং ধারা দুটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।’
‘আসলে হুজুগ’
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভট্টবাবুর পেজ’-এর অ্যাডমিন ও ক্রিয়েটর শিল্পী শুভম ভট্টাচার্য তুলে ধর💙লেন এআই ট্রেন্ডের আরেক বিপজ্জনক দিক। তাঁর কথায়,‘জিবলি আর্টের এই ট্রেন্ড আমি হ♚ুজুগ হিসেবেই দেখছি। তবে এভাবে যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিপুল মাত্রায় আর্টের নির্মাণ হয়, তাহলে আমাদের মতো শিল্পীদের সমস্যা হতে পারে। ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স যত উন্নত হবে, তত বিভিন্ন সংস্থা খরচ কমাতে এর ব্যবহার বাড়িয়ে দেবে।’

জীবিকার প্রতিও কি বিপদ সংকেত?
তাহলে কি এআই শিল্পীর প্রতি অসম্মানের পাশাপাশি তাঁর জীবিকার প্রতিও কি বিপদ 👍সংকেত? ভট্টবাবুর কথায়, ‘বিষয়টা কে কীভাবে দেখছেন, সেটাও এখানে ভাববার বিষয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করেন একটা শিল্পকর্মের জন্য, তাদের খারাপ লাগা স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে আমার বিশ্বাস এআই কোনওদিনই মানুষের কল্পনাশক্তিকে পেরিয়ে যেতে পারবে না।’
‘শিল্পীর অনুমতি না নিয়ে এই কাজ অনুচিত’
নিছক ট্রেন্ড হলেও শিল্পীর কাজ অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা অনুচিত বলেই মনে করেন শিল্পী শ্রীকান্ত গুঁই। ১৫ বছর ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন অ্যানিমেশনের আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন শ্রীকান্ত। হায়দরাবাদ থেকে ফোনে জানালেন, ‘আমি যখন কাজ শুরু করেছিলাম, তখন বেশিরভাগটাই ছিল ম্যানুয়াল অর্থাৎ হাঁতে আকা। আমরা যারা অ্যানিমেটর, তাঁরা দুজনকে ওয়া♒র্ল্ড অ্যানিমেশনের পথিকৃৎ হিসেবে মনে করি— একজন রিচার্ড উইলিয়ামস, অন্যজন হায়াও মিয়াজাকি। ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’তে মিয়াজাকির ম্যানুয়াল কাজই অস্কার পুরস্কারে সম্মানিত হয়। বহুদিনের পরিশ্রমের ফসল তাঁর এই জিবলি ঘরানা। সেখানে তাঁকে প্রাপ্য সম্মান না দিয়েই যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে জিবলি।’

‘অবশ্যই শিল্পীর অসম্মান’
টেকনোলজি এখন সবকিছুতেই। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স নিয়েও আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু শিল্পীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান সবসময় দেওয়া উচিত। তাঁর এত বছরের সাধনা লঘু বিনোদনের কাজে ব্যবহার করে যাচ্ছে মানুষ। মিয়াজাকি সংবাদমাধ্যমকে যখন তাঁর মতামত জানালেন, তখন হয়তো কারও কারও হুঁশ ফিরল। শিল্পীর পেটেন্ট থাকা শিল্প ব্যবহারের আগে অনুমতি নেওয়া অবশ্যই জরুরি। আমার নিজের ছবি নিয়ে এমনটা হলে আমারও খারাপ লাগবে। ২০ বছর ধরে 🐟পেন্টিং করতে করতে আমার একটি স্টাইল তৈরি হয়েছে। সেই স্টাইল যখন কেউ নকল করছে, তিনি যদি একবার অনুমতি নেন বা নামটা উল্লেখ করেন, তাহলে শিল্পী এতটা অসম্মানিত বোধ করেন না। আমার ছবি সম্বলিত একাধিক বই প্রতি বছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়। লেখকরা কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই আমাকে আগে থেকে অবগত করেন, হায়দরাবাদে এক কপি বইও পাঠান। জানি না, মিয়াজাকির স্টাইল নকল করার আগে এই অনুমতি ক’জন নিয়েছেন। যদি না নিয়ে থাকেন, তাহলে শিল্পীর অসম্মানের পাশাপাশি অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রির জন্যও এটি দুঃখজনক ব্যাপার।’